বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৮ দফা দাবি
প্রতিটি দাবির প্রেক্ষাপট ও বিস্তারিত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো।
টিকাদান, বিদ্যুৎ, কৃষি, শিল্প, অর্থনীতি ও জনসেবাসহ রাষ্ট্রের অর্জিত সক্ষমতা কীভাবে ধ্বংস করা হলো, তার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, জবাবদিহিতা, বিচার এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে।
আওয়ামী লীগের শাসনামল দেশের প্রতিটি খাতে সমৃদ্ধি, সক্ষমতা ও নিরাপত্তা এনেছিল। আওয়ামী লীগের অবর্তমানে যারা দেশ শাসন করেছে এবং এখনো করছে, তারা সেই সমৃদ্ধিকে সর্বতোভাবে ধ্বংস করে দেশকে বহু দশক পিছিয়ে দিয়েছে। আওয়ামী লীগের তাই ন্যায়সঙ্গত অধিকার এবং দায়িত্ব আছে দেশবাসীর পক্ষ থেকে জবাব চাইবার। এই জবাব আওয়ামী লীগের কাছে পরবর্তী সরকারগুলোকে দিতেই হবে। তাই দেশবাসীর পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের দাবি :
- [১.১]টিকার অভাবে যে হাজার হাজার শিশু মৃত্যুবরণ করেছে সে সব শিশুমৃত্যুর প্রতিটি ঘটনাকে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দেশের সুপ্রতিষ্ঠিত টিকাদান কর্মসূচি কিভাবে ভেঙে পড়ল, কেন সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতা তৈরি হলো, এবং এর ফলে শিশুস্বাস্থ্যে চরম বিপর্যয় নেমে এলো, তার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করতে হবে এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
- [১.২]জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে অর্জিত সক্ষমতা কীভাবে অদক্ষতা, দুর্নীতি ও নীতিগত ব্যর্থতায় ভেঙে পড়ল, এবং কীভাবে তা খাদ্য উৎপাদন, শিল্প ও সামগ্রিক অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে দেশকে সংকট ও দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে ঠেলে দিল—তার তদন্ত ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
- [১.৩]কৃষি খাতে নীতিগত ব্যর্থতা ও অযোগ্য ব্যবস্থাপনার কারণে কৃষক ও সরবরাহকারীরা যে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন, তার সুষ্ঠু ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে।
- [১.৪]ইউনুস সরকারের আইন প্রয়োগে ব্যর্থতা, প্রশাসনিক অচলাবস্থা এবং মব-নির্ভর সহিংসতার ফলে কলকারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গিয়ে যে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক, কর্মচারী ও উদ্যোক্তা জীবিকা হারিয়েছেন, তার স্বাধীন তদন্ত করতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য অবিলম্বে জরুরি পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে।
- [১.৫]৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর অর্থনীতির ধারাবাহিক অগ্রগতি কোথায় এবং কীভাবে ভেঙে পড়েছে, তা জাতির সামনে স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করতে হবে। বিশেষত নারী উন্নয়ন, বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ, অবকাঠামোগত অগ্রগতি এবং জঙ্গীবাদ দমনের ক্ষেত্রে যে পশ্চাৎগতি ও অবনমন ঘটেছে, তা দেশবাসীর কাছে প্রকাশ করতে হবে।
জননেত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ ও এর নেতাকর্মী-সমর্থকসহ সাংবাদিক, শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সকল মামলা ও রায় বাতিল এবং আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে পূর্ণ রাজনৈতিক অধিকার পুনর্বহাল করতে হবে।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দেশের সর্ববৃহৎ এবং প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল, যে দল এই দেশটি প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে। স্বাধীন দেশের প্রতিষ্ঠাতা এই দলের রাজনৈতিক কর্মকান্ডের অধিকার খর্ব করার যে কোন হীন চেষ্টা অচিন্তনীয় ও অবাস্তব। দেশের আইনকে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা আর দমনের অস্ত্রে পরিণত করার সব অপতৎপরতা প্রতিহত করতে এবং আইন ও ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে :
- [২.১]প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সকল প্রহসনমূলক মামলা, একপেশে তদন্ত ও বিচার, এবং এসবের ভিত্তিতে প্রদত্ত সকল রায় অবিলম্বে বাতিল ঘোষণা করতে হবে।
- [২.২]আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর ওপর আরোপিত সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানোর অধিকার পুনর্বহাল করতে হবে। বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে চলমান দমন-পীড়ন, নির্যাতন ও হয়রানি বন্ধ করতে হবে। কারাভ্যন্তরে সংঘটিত প্রতিটি মৃত্যু, নির্যাতন, চিকিৎসা বঞ্চিতকরণ ও অমানবিক আচরণের ঘটনার পৃথক তদন্ত ও বিচার করতে হবে।
- [২.৩]দেশের আইন ও বিচারব্যবস্থার অপব্যবহার করে আওয়ামী লীগ এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সাংবাদিক, শিক্ষক, লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সব ধরণের আইনি হয়রানি অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। অন্যায়ভাবে আটককৃত সকল রাজবন্দীদের বিনা শর্তে মুক্তি দিতে হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে সকল মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। প্রতিটি হয়রানির ঘটনার তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। ভুক্তভোগীদের প্রতি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে।
- [২.৪]বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। ছাত্রলীগের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ব্যাহত শিক্ষা জীবন ফিরিয়ে দিতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও দমন-পীড়নের অংশ হিসেবে ছাত্রলীগের কর্মী-সমর্থকদের শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করার সকল অপচেষ্টা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। শিক্ষাজীবন থেকে তারা যে মূল্যবান সময় হারিয়েছে, তা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
- [২.৫]বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের উপর সব ধরণের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দমন পীড়ন ও হয়রানী অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। প্রতিটি হয়রানী, চাকুরিচ্যুতি, পদচ্যুতির ঘটনার তদন্ত, বিচার এবং ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে।
- [২.৬]অন্তর্বর্তী সরকারের প্রত্যক্ষ মদতে ও পরোক্ষ প্রশ্রয়ে সহিংস মবের মাধ্যমে সংঘটিত প্রতিটি হত্যা, আহত করা, হয়রানি ও চাকরিচ্যুতির ঘটনাসমূহের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
- [২.৭]৫ই আগস্ট ২০২৪ পরবর্তী সময়ে সাজাপ্রাপ্ত জঙ্গি ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাজাপ্রাপ্তদের মুক্তি ও অব্যাহতিদানের প্রতিটি প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করতে হবে।
জুলাই–আগস্ট ২০২৪-এর সকল হত্যা, সহিংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞের স্বাধীন, নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হলো রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা নির্মাণের পূর্বশর্ত। ইউনুস সরকার জুলাই-আগস্ট সহিংসতার তদন্ত ও বিচার করতে কেবল ব্যর্থই হয়নি, তারা একে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও ইতিহাস-বিমুখ মিথ্যা বয়ান তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে, সহিংসতায় জড়িতদের একপাক্ষিক দায়মুক্তি দেওয়ার মাধ্যমে প্রকৃত সত্যকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। গণমুখী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সবসময়ই আইনের শাসন ও জবাবদিহিতায় বিশ্বাসী। সেই আত্ম-বিশ্বাস থেকেই ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়েই আওয়ামী লীগ জুলাই ঘটনাবলীর বহুমুখী তদন্ত শুরু করেছিল, যা ইউনুস সরকার ক্ষমতায় এসেই থামিয়ে দেয় এবং সত্য চিরতরে ধামাচাপা দিতে অপরাধীদের দায়মুক্তির ব্যবস্থা করে। ইউনুস সরকারের সাথে আওয়ামী লীগের পার্থক্য এখানেই। তাই :
- [৩.১]জুলাই–আগস্ট ২০২৪-এর ঘটনাবলিতে সাধারণ জনগণ, দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, নিরপরাধ শিশু-কিশোর এবং দল-মত নির্বিশেষে সকল রাজনৈতিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, অঙ্গহানি ও অন্যান্য অপরাধের প্রতিটি ঘটনার পৃথক, সুনির্দিষ্ট, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
- [৩.২]দল ও পক্ষ নির্বিশেষে জুলাই-আগস্ট এ সংঘটিত ঘটনাবলির প্রকৃত সত্য উদঘাটন ও সুষ্ঠু বিচার ব্যাহত করে এমন সব ধরনের আগাম দায়মুক্তি আইন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাতিল করতে হবে।
- [৩.৩]আওয়ামী লীগ সরকার জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ঘটনাবলীর বিচারকল্পে যে সব পদক্ষেপ নিয়েছিল (যেমন: প্রতিটি মৃত্যুর বিপরীতে ফৌজদারী প্রক্রিয়া, পুলিশের আভ্যন্তরীণ বিভাগীয় তদন্ত, বিচার বিভাগীয় তদন্ত, আন্তর্জাতিক সহায়তা আহ্বান), অন্তর্বর্তী সরকার সেগুলো কেন এগোতে দিলো না, তা তদন্ত করতে হবে।
৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর সংঘটিত রাজনৈতিক, সাম্প্রদায়িক ও সাংস্কৃতিক নিপীড়ন, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ তদন্ত করে বিচার, নিরাপত্তা এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত ঐতিহাসিক স্থাপনার পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করতে হবে।
আওয়ামী লীগের অবর্তমানে ৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশে একটি পরিকল্পিত গণহত্যা বা জেনোসাইড শুরু হয়েছে, যা দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে নির্মূলকরণে, সংখ্যালঘু গোষ্ঠীসমূহের নির্মূলকরণে এবং কার্যত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তির সকল মানুষের নির্মূলকরণে চলমান। পাশাপাশি, ইতিহাস ‘রিসেট’ এর নামে ইতিহাস বিকৃতির ছত্রছায়ায় এই সব অপরাধ শুধু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই সংঘটিত অপরাধ নয়, বরং তা গোটা মানবজাতির বিরুদ্ধে অপরাধ। এর বিচার ও প্রতিকার না হলে তা দেশকে দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতসহ গৃহযুদ্ধ এবং ব্যর্থ রাষ্ট্রের অনিবার্যতার দিকেও ঠেলে দিতে পারে। তাই :
- [৪.১]আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী-সমর্থক, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ এবং হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, সুফি ও আহমদিয়া সম্প্রদায়, তৃতীয় লিঙ্গ গোষ্ঠীর মানুষের বিরুদ্ধে সংঘটিত সহিংসতা, নিপীড়ন ও আক্রমণের প্রতিটি ঘটনার তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
- [৪.২]উল্লিখিত ঘটনাবলির প্রকৃতি ও ব্যাপ্তি বিবেচনায় যেসব ঘটনা গণহত্যা, সাংস্কৃতিক গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের মধ্যে পড়ে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের আলোকে সে সব অপরাধের গ্রহণযোগ্য, নিরপেক্ষ এবং আন্তর্জাতিক মানের তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে, এবং রাষ্ট্র যদি অপারগ হয় সেক্ষেত্রে প্রয়োজনে রোম সংবিধির আওতায় প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের শরণাপন্ন হতে হবে।
- [৪.৩]জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক বাসভবন ও স্মৃতিসংগ্রহশালা ৩২ নম্বর ধ্বংস, সংসদ ভবন আক্রমণ, বিভিন্ন জাদুঘর ও ঐতিহাসিক সংগ্রহশালাসহ দুই সহস্রাধিক মুক্তিযুদ্ধের স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন ধ্বংসের প্রতিটি ঘটনার তদন্ত ও বিচার করতে হবে।
- [৪.৪]এসব ধ্বংসযজ্ঞ সংঘটিত হতে দেওয়া, মবকে প্রশ্রয় দেওয়া এবং পরবর্তীতে অপরাধীদের দায়মুক্তি দেওয়ার পিছনে দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
- [৪.৫]ধ্বংসপ্রাপ্ত নিদর্শন ও স্থাপনাগুলোর পুনর্নির্মাণ, পুনরুদ্ধার ও সুরক্ষার জন্য অবিলম্বে রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
জুলাই সংঘাতের পেছনের দেশীয় ও বিদেশী ষড়যন্ত্র উন্মোচন করে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সংকট যদি বহিরাগত বা সংগঠিত বিদেশী ষড়যন্ত্রের ফল হয়, তবে তা কেবল আভ্যন্তরীন আইনশৃঙ্খলা কিংবা মানবাধিকারের বিষয় থাকে না, তা হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রশ্ন। প্রবল ক্ষমতাধর বহু বিদেশী শক্তির অপতৎপরতা নস্যাৎ করেই স্বাধীন সার্বভৌম এই বাংলাদেশের জন্ম, আত্ম-নিয়ন্ত্রণের অধিকার ছিল যার মূলমন্ত্র। জননেত্রী শেখ হাসিনা পাঁচ বার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশ শাসন করেছেন এই মূলমন্ত্র হৃদয়ে ধারণ করেই। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে প্রাণও দিয়েছেন দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে আত্ম-নিয়ন্ত্রণের এই মূলমন্ত্র সমুন্নত রাখতে গিয়েই। সত্য গোপন রেখে কোনো জাতি নিরাপদ থাকতে পারে না। দায়ী শক্তিগুলোকে চিহ্নিত না করলে এবং তাদের জবাবদিহিতার আওতায় না আনা হলে বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধে এই সব বহিঃশক্তির ষড়যন্ত্র অব্যাহত থাকবে। তাই :
- [৫.১]বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা রক্ষার স্বার্থে, জুলাই–আগস্ট ২০২৪-এর ঘটনাবলীর পেছনে দেশীয় ও বিদেশী সংশ্লিষ্টতার আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন, স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত করতে হবে।
- [৫.২]সংশ্লিষ্ট দায়ী পক্ষসমূহকে চিহ্নিত করে তাদের নাম প্রকাশ করতে হবে।
- [৫.৩]তাদের বিচারের জন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
অবৈধ ক্ষমতা দখল, সংবিধান লঙ্ঘন ও রাষ্ট্রদ্রোহমূলক কর্মকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
জনগণের ম্যান্ডেটকে উপেক্ষা করে, সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে যে কোনো ক্ষমতা দখল বা চর্চা কেবল বেআইনি নয়, তা সরাসরি জনগণের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর থেকে বাংলাদেশে যে শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা জনগণের রায়ের উপর নয়, বরং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, প্রশাসনিক অপব্যবহার এবং সংবিধান অস্বীকারের উপর দাঁড়িয়ে আছে। এই প্রক্রিয়ায় কেবল সংবিধানকেই অবমাননা করা হয়নি, সংসদকেও উপেক্ষা করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রদ্রোহমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশের গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। এই অবস্থা চলতে দেওয়া মানে আইনবিরোধী অরাজকতাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া। তাই :
- [৬.১]৫ আগস্ট ২০২৪ থেকে বর্তমান পর্যন্ত জনগণের ম্যান্ডেটবিহীনভাবে ক্ষমতা দখল, ক্ষমতায় থাকার অপচেষ্টা, রাষ্ট্রদ্রোহ, সংবিধান লঙ্ঘন এবং সংসদ অবমাননার প্রতিটি ঘটনার পূর্ণাঙ্গ, নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন তদন্ত করতে হবে।
- [৬.২]রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার, এবং জনগণের অধিকার দমনের মাধ্যমে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার প্রতিটি ঘটনায় দায়ীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
- [৬.৩]ভবিষ্যতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে ক্ষমতা দখল বা চর্চা করতে না পারে, সে লক্ষ্যে সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে এবং জনগণের সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় কার্যকর প্রতিরোধ কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
ইউনুস ও বিএনপি সরকারের সকল সিদ্ধান্ত, নিয়োগ, ব্যয়, চুক্তি ও দুর্নীতির স্বচ্ছ তদন্ত করে পূর্ণ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো জবাবদিহিতা। প্রতিটি সরকার, অন্তর্বর্তী হোক বা নির্বাচিত, তার প্রতিটি সিদ্ধান্তের জন্য জনগণের কাছে দায়বদ্ধ, কারণ এই রাষ্ট্র এবং তার সকল সম্পদের প্রকৃত মালিক হল জনগণ। তাই ইউনুস সরকার এবং বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত, চুক্তি, নিয়োগ ও আর্থিক কার্যক্রমের পর্যালোচনা এবং খতিয়ান প্রদান কেবল প্রশাসনিক অনুশীলন নয়, এটি জনগণের মৌলিক অধিকার ও সরকারের বৈধতার মাপকাঠি। তাই :
- [৭.১]৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরবর্তীকালে বিএনপি সরকারের অধীনে গৃহীত বা তাদের দ্বারা প্রভাবিত সকল সরকারি সিদ্ধান্ত, রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ব্যয়, চুক্তি, সমঝোতা, মামলা, শাস্তিমুক্তি ও দায়মুক্তি প্রদান, অনুমোদন ও সুবিধা বিতরণের স্বচ্ছতা ও বৈধতা নিরীক্ষণ করতে হবে এবং তা দেশবাসীকে জানাতে হবে।
- [৭.২]দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের প্রতিটি অভিযোগ তদন্ত করতে হবে।
- [৭.৩]সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে প্রতিটি নিয়োগ, বদলি, চাকুরিচ্যুতির নিয়মতান্ত্রিকতা ও বৈধতা তদন্ত করতে হবে।
- [৭.৪]উক্ত তদন্তসমূহের বিস্তারিত ফলাফল অবিলম্বে দেশবাসীর সামনে প্রকাশ করতে হবে।
রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ববিরোধী সব চুক্তি ও কর্মকাণ্ডের স্বাধীন পর্যালোচনা, প্রকাশ এবং প্রয়োজনীয় সংশোধন নিশ্চিত করতে হবে।
রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব একটি জাতির আত্মমর্যাদা, স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার প্রশ্ন। ইতিহাস বলে—যখনই কোনো সরকার জনগণের ম্যান্ডেটহীন অবস্থায় ক্ষমতায় থাকে, তখন তারা প্রায়শই দেশের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে নিজেদের টিকে থাকার জন্য দেশীয় ও বিদেশী শক্তির সাথে আপস করে। ম্যান্ডেটহীনভাবে ক্ষমতা দখলের পর থেকে ইউনুস সরকার তাদের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, গোপন ও প্রকাশ্য চুক্তি, এবং বিদেশী শক্তির প্রতি নতজানু অবস্থানের মাধ্যমে দেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এসবের স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে জাতীয় স্বার্থ, স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব আরও বিপন্ন হবে। তাই :
- [৮.১]ইউনুস সরকারের আমলে সম্পাদিত এবং পরবর্তীতে বিএনপি সরকার দ্বারা বহাল রাখা সকল আন্তর্জাতিক চুক্তি, সমঝোতা স্মারক, কৌশলগত অংশীদারিত্ব এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পর্যালোচনা করতে হবে।
- [৮.২]যেসব চুক্তি ও সমঝোতা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বার্থ বা নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতার পরিপন্থী, সেগুলো চিহ্নিত করে দেশবাসীর সামনে প্রকাশ করতে হবে এবং প্রয়োজনে তা বাতিল বা পুনঃআলোচনার উদ্যোগ নিতে হবে।
- [৮.৩]এই ধরনের চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের গোপনীয়তা, ক্ষমতার অপব্যবহার, রাষ্ট্র ও দেশের জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা, দুর্নীতি বা বিদেশী চাপ কাজ করেছে কি না, তা তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর দায় নিরূপণ করতে হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
- [৮.৪]ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করতে পারে—এমন কোনো চুক্তি বা সমঝোতা যাতে গোপনে বা জনগণের জবাবদিহিতার বাইরে সম্পাদিত না হয়, সে লক্ষ্যে সংসদীয় নজরদারি, স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক অনুমোদন প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে।
স্বাক্ষর করতে প্রস্তুত?
আপনার স্বাক্ষর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি স্বাক্ষর ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিকে আরও শক্তিশালী করে।
সম্মতি জ্ঞাপন করতে স্বাক্ষর করুন →